যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা ও এআই নিয়ে সংশয়

এশিয়ার শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে শঙ্কার কারণে এশিয়ার শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

গতকাল লেনদেন শেষে এশিয়ার বেশির ভাগ প্রধান সূচক নিম্নমুখী ছিল। তবে একই সময়ে প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনিশ্চয়তার এই সময়ে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে সরে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। খবর রয়টার্স ও এপি।

গতকাল জাপানের টোকিও শেয়ারবাজারে নিক্কেই ২২৫ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শেয়ারের দরপতনই এ পতনের মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রাইভেট ক্রেডিট প্রতিষ্ঠান ব্লু আউল ক্যাপিটাল একটি তহবিল থেকে সম্পদ বিক্রি এবং প্রান্তিকভিত্তিক অর্থ উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দিলে বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বেসরকারি ইক্যুইটি ও ঋণ খাতে তারল্য সংকটের আশঙ্কা জোরালো হয়।

জাপানের শীর্ষ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান মিৎসুবিশি ইউএফজে ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের শেয়ার ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। গাড়ি নির্মাতা টয়োটা মোটর করপোরেশন ও প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা সনি করপোরেশনের শেয়ারও যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭ ও ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। প্রযুক্তি খাতে ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

চান্দ্র নববর্ষের ছুটি শেষে হংকংয়ের শেয়ারবাজার খুললেও হ্যাং সেং সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ই-কমার্স ও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিক্রির চাপ বেশি ছিল। যদিও চীনের মূল ভূখণ্ড ও তাইওয়ানের বাজার এখনো বন্ধ, তবু হংকংয়ের পতন পুরো অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় চিত্র ছিল ভিন্ন। দেশটির প্রধান সূচক কসপি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৮০৮ পয়েন্টে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। দেশটির বড় অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হানওয়া অ্যারোস্পেসের শেয়ার একদিনেই ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনিশ্চিত সময়ে প্রতিরক্ষা খাতকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারেও। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিশোধিত তেলের দাম গত আগস্টের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর এশীয় দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাপানি ইয়েন দুর্বল হয়ে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৫৫ দশমিক ১ ইয়েনে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপ তৈরি করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর সময়সীমা দেয়ার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, কূটনৈতিক সমাধান না হলে পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে গড়াতে পারে। ডাইওয়া সিকিউরিটিজের প্রধান কৌশলবিদ কেনজি আবে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার থেকে সরে সোনা ও তেলের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন।’

অন্যদিকে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চাপে কিছু প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতে ব্যাপক ঋণনির্ভর বিনিয়োগ হয়েছে। ফলে আয় প্রত্যাশা মাফিক না হলে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। তবে তাদের মতে, এটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং তারল্য সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে।

এদিকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার দামও বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে বাজারে এখন সতর্কতা ও অপেক্ষার মনোভাব বিরাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতিতে কী সিদ্ধান্ত আসে—সেটির ওপরই আগামী দিনের বাজারের গতিপথ নির্ভর করবে।

আরও